দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

পৃথিবীতে কোনো মহাবিপর্যয় নেমে এলে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ফসল উৎপাদন শুরু করতে সংরক্ষিত বীজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে হিমায়িত করে রাখলেই এসব বীজ শত শত বছর টিকে থাকবে, এমন ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নতুন এক গবেষণা। বরং কয়েক দশক পরও কোন বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা বেশি থাকে, তা জানতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে পেয়েছেন মুগের বীজকে।
অস্ট্রেলিয়ার গবেষকেরা দেশটির অস্ট্রেলিয়ান গ্রেইনস জিনব্যাংকে সংরক্ষিত ৩ হাজার ৮৬১টি বীজের ব্যাচ পরীক্ষা করেছেন। ছয় ধরনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফসলের এসব বীজের মধ্যে ছিল জোয়ার, সাধারণ শিম, মুগ, সয়াবিন, অড়হর ও মটরশিমের একটি প্রজাতি। পরীক্ষায় কিছু বীজের বয়স ছিল ১৯৬০ এর দশকের।
গবেষণার ফল বলছে, মুগের বীজই সবচেয়ে দীর্ঘদিন অঙ্কুরোদ্গমের সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। এরপর রয়েছে জোয়ার। মুগ, সাধারণ শিম ও সয়াবিনের কিছু ব্যাচ কয়েক দশক ধরে সংরক্ষিত থাকার পরও উচ্চমাত্রায় অঙ্কুরোদ্গমের সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া গেছে মুগের একটি ব্যাচে। ৪৫ বছর সংরক্ষণে থাকার পরও ওই ব্যাচের অন্তত ৯০ শতাংশ বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। অর্থাৎ কয়েক দশক ধরে হিমায়িত অবস্থায় থাকার পরও এসব বীজ থেকে নতুন গাছ জন্মানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান গ্রেইনস জিনব্যাংক বিশ্বের অন্যতম বড় ও বৈচিত্র্যময় ফসলের জিনভান্ডার। সেখানে শস্য, ডাল ও তেলবীজের কয়েক লাখ ধরনের বীজ সংরক্ষণ করা হয়েছে। বীজের স্বাভাবিক স্থায়িত্ব বাড়াতে প্রতিটি প্যাকেট ১৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়।
তবে এসব বীজ আসলে কতদিন কার্যকর থাকবে, তা বিজ্ঞানীদের পুরোপুরি জানা নেই। বর্তমানে প্রায় ৭০টি উদ্ভিদ প্রজাতির বীজের সম্ভাব্য স্থায়িত্ব সম্পর্কে পূর্বাভাস রয়েছে। নতুন গবেষণার ফল বলছে, আগের কিছু হিসাব বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।
গবেষণায় অড়হরের বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে। গড়ে ৩৬ বছর সংরক্ষণের পর পরীক্ষা করা অড়হরের মাত্র চারটি ব্যাচে ৮৫ শতাংশের বেশি বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার সক্ষমতা ছিল। এতে বোঝা যায়, এসব বীজের অনেক ব্যাচ নতুন বীজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে মুগের স্থায়িত্বের ফলাফল ছিল সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, কোনো বীজ পরীক্ষাগারে অঙ্কুরিত হলেই সেটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর উদ্ভিদে পরিণত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অঙ্কুরোদ্গমকে এখানে বীজের কার্যকারিতা বোঝার একটি সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। একটি বীজ থেকে পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ তৈরি হতে আরও কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বীজের সম্ভাব্য স্থায়িত্বের আগের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব পরীক্ষার বড় পার্থক্য। মটরশিমের ওই প্রজাতির গড় সম্ভাব্য স্থায়িত্বের নতুন হিসাব মাত্র ১৭ দশমিক ৪ বছর। অথচ আগের তাত্ত্বিক মডেলগুলোতে ধারণা করা হয়েছিল, এসব প্রজাতির হিমায়িত বীজ শত শত বছর, এমনকি হাজার বছর পর্যন্ত পরীক্ষা না করেও সংরক্ষণ করা সম্ভব।
আগের হিসাব অনুযায়ী, জোয়ারের বীজের অঙ্কুরোদ্গম পরীক্ষা করার ব্যবধান হতে পারত ২ হাজার ৯০১ বছর। মুগের ক্ষেত্রে এই ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৭৫ বছর। কিন্তু বাস্তব পরীক্ষায় দেখা গেছে, সর্বোত্তম দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ পরিবেশেও ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যেই সব প্রজাতির কিছু বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ৮৫ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও বীজ শারীরতত্ত্ববিদ ক্যাথরিন বাউমের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল বলছে, এত দীর্ঘ সময় পরপর বীজের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বীজভান্ডারগুলোকে নিয়মিত অঙ্কুরোদ্গমের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং বীজের স্থায়িত্ব নিয়ে পাওয়া তথ্য পরস্পরের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে হবে। এতে কোন প্রজাতির বীজ কতদিন কার্যকর থাকে, সে সম্পর্কে আরও নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘প্ল্যান্ট জেনেটিক রিসোর্সেস’ সাময়িকীতে।
নরওয়ের ‘কিয়ামতকালীন বীজভান্ডার’সহ বিশ্বের বিভিন্ন বীজভান্ডারে ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, বীজ সংরক্ষণ করাই শেষ কথা নয়। দীর্ঘদিন এসব বীজ কার্যকর রাখতে নিয়মিত পরীক্ষা, তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো বীজের ব্যাচ নতুন বীজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করাও জরুরি।
/অ